বম বম ভোলে ... অমরনাথ যাত্রা করতে হলে শারীরিক সক্ষমতার যে ডাক্তারি শংসাপত্র নিতে হয় আমার বাড়ির কাছে সাগর দত্ত হাসপাতাল থেকে তিন দিন ঘুরে অবশেষে সেটি সংগ্রহ করলাম। এরপর অমরনাথ শ্রাইন বোর্ডের ওয়েবসাইটে সেই ডাক্তারি শংসাপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অনলাইন যাত্রার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হল। গতবছর অমরনাথ যাত্রা চলেছে তেসরা জুলাই থেকে ৯ই অগাস্ট পর্যন্ত। যাত্রার জন্য ডাক্তারি শংসাপত্র নেওয়ার কাজ এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এবং অনলাইন পারমিট রেজিস্ট্রেশনের কাজ এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে যায়। যাওয়া আসার জন্য ফ্লাইটের টিকিট কেটে নিয়ে প্রতীক্ষায় রইলাম সেই নির্ধারিত দিনের জন্য।
একটি পিঠব্যাগে দরকারি সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ২৪শে জুলাই ভোর তিনটেয় কলকাতার বাড়ি থেকে দমদম এয়ারপোর্টের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। সকাল সাড়ে পাঁচটায় ইন্ডিগোর ফ্লাইটে দিল্লী হয়ে সকাল এগারোটায় শ্রীনগর পৌঁছলাম। এরপর এয়ারপোর্ট থেকে একটি শেয়ার গাড়ি করে কাশ্মীরের অপরূপ উপত্যকার রসাস্বাদন করতে করতে পহেলগাঁওর নুনওয়ান বেস ক্যাম্পে পৌঁছলাম। নির্ধারিত কাউন্টারে অমরনাথ যাত্রার পারমিট দেখিয়ে আর-এফ-আই-ডি কার্ড সংগ্রহ করলাম। ক্যাম্পের ভাণ্ডারাতে হরেকরকম সুস্বাদু খাবার সহযোগে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে নিলাম। লিডার নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল। পথের ধারে বিভিন্ন জায়গায় অমরনাথ যাত্রার সুদৃশ্য ব্যানার ও বোর্ড চোখে পড়ছিল। পহেলগাঁওর মেইন মার্কেট এলাকার একটি হোটেলে সেদিনের রাতের জন্য আস্তানা গাড়লাম।

পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে রাস্তায় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। ভোর পাঁচটায় ভোরের আবছা আলোয় গাড়ি ছাড়া শুরু হলো। একটি শেয়ার গাড়ি করে চন্দনবাড়িতে পৌছলাম। চেক পোস্টে আর-এফ-আই-ডি কার্ড দেখিয়ে ও ব্যাগের সিকিউরিটি চেক সেরে স্থানীয় একটি ভাণ্ডারাতে অল্প কিছু খেয়ে নিয়ে ‘হর হর মহাদেব’ বলে যাত্রা শুরু করলাম। যেহেতু পায়ে হেঁটে পুরো পথ যেতে হবে তাই পিঠের ব্যাগের ভার বেশি বাড়াইনি। কিছুটা পথ যেতেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় অগত্যা ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে যত উপরে উঠছিলাম নিচে চন্দনবাড়িতে যাত্রীদের থাকার নানা রঙের সুদৃশ্য টেন্টগুলো দেখতে দারুণ লাগছিল।

মনোরম সবুজ পাহাড়ি উপত্যকার চড়াই পথে হাঁটতে হাঁটতে পৌছলাম এগারো হাজার ফুট উচ্চতার পিসু টপে। এখানকার ভাণ্ডারাতে খাবার ব্যবস্থা অতি উত্তম। কী নেই খাদ্য তালিকায় রুটি, পরোটা, ইডলি, ধোসা, পোলাও, সরবত, চা, বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি, মোরব্বা সবকিছু। আমিও অল্প করে কিছু খেয়ে প্রাতরাশ সেরে নিলাম। পেট পুরে খেলে হাঁটতে কষ্ট হবে, আর তাছাড়া অমরনাথের এই যাত্রা পথে বিভিন্ন জায়গায় ভাণ্ডারাতে বিনামূল্যে খাওয়া দাওয়ার সুব্যবস্থা তো আছেই।
সবুজ গালিচায় মোড়া পাহাড়ের বুক চিরে প্রবাহিত লিডার নদীর শোভা অতুলনীয়। স্থানীয় ঘোড়সওয়ারদের ঘোড়া নিয়ে যাত্রীর প্রতীক্ষায় থাকতে দেখা যায়। এখানে কিছু জায়গার ভূপ্রকৃতির গঠন গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কথা স্মরণ করাবে। যোজিপল পেরিয়ে নাগাকোটিতে পথের পাশে একটি সুন্দর জলপ্রপাতের সামনে তীর্থযাত্রীদের ফটো তোলার ভিড় দেখা গেল। চড়াই পথে কিছুটা এগিয়ে একটি নদীকে দেখলাম যেন এক ছুটে গিয়ে পান্না সবুজ রঙের জলের শেষনাগ হ্রদে মিশছে। এখান থেকেই বিশাল শেষনাগ হ্রদের একচিলতে প্রথম দর্শন মেলে। আরো কিছুটা এগোলে ১২,৮০০ফুট উচ্চতায় মায়াবী সবুজ পাহাড়ে মোড়া পুরো শেষনাগ হ্রদটি চোখের সামনে সম্পূর্ণ রূপে উন্মুক্ত হয়; কী অপূর্ব তার শোভা। পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় শ্বেতশুভ্র মেঘপুঞ্জ বাসর জমিয়েছে।

অমরনাথ যাত্রা করার জন্য পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়াও ঘোড়া, পাল্কি, পিট্টুর ব্যবস্থা আছে। পথে বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের জন্য শৌচালয়েরও ব্যবস্থা আছে। শেষনাগ বেস ক্যাম্পে অমরনাথ যাত্রীদের রাত্রিযাপনের জন্য থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত আছে। দুপুর দুটোর মধ্যে এখানে পৌঁছতে পারলে তবেই আগে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি মেলে; অন্যথায় যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য শেষনাগেই থেকে যেতে হয়। আমি অনেক আগে পৌঁছে যাওয়ায় আর্মি চেক পোস্টে আর-এফ-আই-ডি কার্ড দেখিয়ে ও ব্যাগের সিকিউরিটি স্ক্যান করে নিয়ে শেষনাগ বেস ক্যাম্পকে ডানপাশে রেখে শেষনাগ হ্রদ থেকে নির্গত নদীর উপরে সেতু পেরিয়ে এগিয়ে চললাম। কিছুটা পথ চলে একটি স্ফটিকস্বছ জলের পাগলপারা ঝর্ণার সাথে দেখা হল। এখানকার পাহাড়ের রূপ লাদাখের ন্যাড়া পাহাড়ের কথা মনে করিয়ে দেবে। ওয়াবল টপ হয়ে খাড়া আরোহণে কঠিন চড়াই পথে পৌঁছে গেলাম অমরনাথ যাত্রার ১৪,৮০০ফুট উচ্চতার সর্বোচ্চ স্থান মহাগুনা টপ বা এম.জি টপ যা গনেশ টপ নামেও পরিচিত। এখানকার হাড়হিম করা শীতল বায়ুপ্রবাহ শরীর অবশ করে দেয়। বিকেল সাড়ে তিনটেয় পৌছলাম পোষপাথরি ।

এখানকার ভান্ডারাও তীর্থযাত্রীদের কাছে তার সুস্বাদু হরেকরকম লোভনীয় খাবারের জন্য খুব জনপ্রিয়। তীর্থযাত্রীদের রাত্রিবাসেরও ব্যবস্থা করা হয়। চন্দনবাড়ি থেকে সকাল ৫:৫৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে পিসু টপ, শেষনাগ, গনেশ টপ, পোষপাথরি হয়ে ৩২ কিমি পথ পায়ে হেঁটে সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটে পঞ্চতরণীতে পৌঁছলাম। পঞ্চতরণীর লাদাখী পাহাড়ের বাহুপাশে আবদ্ধ সবুজ গালিচার মতো মখমলী তৃণভূমি পথের কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। পঞ্চতরণী বেস ক্যাম্পের একটি টেন্টে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা হল। রাতে কাঁপুনি ধরা ঠান্ডা, প্রবল পরিশ্রমের পরেও ঘুম আসতে দেরি হয়।

ভোরে উঠে দেখি চারিপাশের পাহাড়ের মাথা নতুন তুষারপাতে ঢেকে গেছে। বালতি প্রতি একশো টাকা দরে গরম জল কিনে, স্নান সেরে ভোর পাঁচটায় যাত্রাপথের গেট খুললে ভোলেবাবার নাম নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লাম। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে আনন্দ, উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। পঞ্চতরণী নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সঙ্গম টপে এলাম। আগের দিন রাতে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তার অধিকাংশ স্থান ভেজা ছিল। এখান থেকে পবিত্র অমরনাথ গুহার দিকে প্রবাহিত হওয়া অমরাবতী নদীর বেশিরভাগ স্থানের জল জমে বরফ হয়ে আছে। এরপর কিছুটা এগোতেই সারা শরীরে শিহরণ জাগিয়ে দেখা পেলাম ১৩,৫০০ ফুট উচ্চতায় সেই বহু প্রতীক্ষিত পবিত্র শৈবতীর্থ অমরনাথ গুহার। আনন্দে আবেগে চোখে জল চলে এল। অমরাবতী নদীতে তীর্থযাত্রীদের স্নান সারতে দেখা গেল।
সকাল আটটায় একটি ক্লোক রুমে ব্যাগ, মোবাইল এবং নির্দিষ্ট স্থানে জুতো রেখে খালি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে গুহার দিকে এগিয়ে চললাম। গুহার মুখের কাছে এক জোড়া পায়রাকে উড়ে যেতে দেখলাম। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, শিব ও পার্বতীর 'অমর কথা' শোনা পায়রা দুটি অমরত্ব লাভ করেছিল। হিসেব করে দেখলাম সেদিন শ্রাবণ মাসের দশম দিন। গুহায় প্রবেশ করে শিবলিঙ্গ ও মন্দির দর্শন সেরে অনেকটা সময় এখানে কাটালাম। দেহ ও মন এক অনাবিল আনন্দে শিহরিত হয়ে ওঠে। সে এক দৈবিক পরিবেশ। সত্য ও সুন্দরের প্রতিমূর্তি ঈশ্বরকে পেতে গেলে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। জীবন ধন্য হয়ে গেল মনে হচ্ছিল। প্রসাদ সংগ্রহ করে গুহা থেকে নেমে এলাম।

ব্যাগপত্র সংগ্রহ করে ফেরার যাত্রা, বালতালের পথে হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তার পাশের হিমবাহের কাছে যেতেই দমকা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছিল। পথে কয়েকটি প্রকাণ্ড আকৃতির পাহাড়ী মূষিকের দেখা পেলাম। সিন্ধু নদীর নৈসর্গিক রূপ আস্বাদন করতে করতে একটি লঙ্গরে এসে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে নিলাম। ডোমেইল হল অমরনাথ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বা চেকপয়েন্ট যেখানে এসে আমার আর-এফ-আই-ডি কার্ড টি কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দিতে হল।
অমরনাথ যাত্রার পুরো পথটির সুরক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা। অমরনাথ শ্রাইন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এই তীর্থযাত্রার ব্যবস্থাপনা অতীব প্রশংসনীয়। সেই সকালে পঞ্চতরণী থেকে যাত্রা শুরু করে সঙ্গম টপ হয়ে পবিত্র অমরনাথ গুহার দর্শন সেরে ডোমেইল হয়ে সর্বমোট ২৪ কিমি পথ পায়ে হেঁটে বালতাল বেস ক্যাম্পে পৌঁছলাম বিকেল সাড়ে তিনটেয়। এদিনের পথে চড়াই-উতরাই উভয়ই থাকলেও কঠিন উৎরাইয়ের ভাগই বেশি ছিল। বালতাল থেকে একটি শেয়ার গাড়ি করে সোনমার্গে পৌঁছাই সেখানেই রাত্রিবাস। অমরনাথ যাত্রা ও দর্শন নিঃসন্দেহে জীবনের একটি বড় মাইলস্টোন।

জরুরি তথ্য:
অমরনাথ যাত্রার রেজিস্ট্রেশন সহ অন্যান্য যাবতীয় তথ্য পাওয়া যাবে শ্রী আমারনাথ জি শ্রাইন বোর্ডের ওয়েবসাইট https://jksasb.nic.in/ থেকে। শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা ও ডাক্তারি শংসাপত্র নিতে হবে বোর্ডের দ্বারা নির্ধারিত নির্দিষ্ট হাসপাতাল থেকে। অনলাইন পার্মিট তথা রেজিস্ট্রেশনের কাজ বোর্ডের ওয়েবসাইটে করা যায়। অফলাইনে রেজিস্ট্রেশন, বোর্ডের দ্বারা নির্ধারিত নির্দিষ্ট কিছু ব্যাঙ্ক শাখা থেকে করা যাবে। অমরনাথ যাত্রা পহেলগাঁও-চন্দনবাড়ি বা বালতাল-ডোমেইল উভয় রুটেই করা যায়। যাত্রা শুরুর আগে বেস ক্যাম্প থেকে প্রত্যেক যাত্রীকে আর-এফ-আই-ডি বা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন কার্ড নেওয়া বাধ্যতামূলক।