দার্জিলিং হিমালয়ের কোলে ছবির মতো ছোট্ট সুন্দর একটি গ্রাম। নাম পালমাজুয়া। পালমা নামের একটি ঝোরা এই গ্রামের মধ্যে দিয়ে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। পাহাড় ও অরণ্যে ঘেরা কোলাহলমুক্ত এই নির্জন হ্যামলেটটি ভরে থাকে রকমারি পাখির ডাক, বয়ে চলা পাহাড়ি নদী আর হিমেল বাতাসে। সেই সঙ্গে নানান বনফুলের গন্ধ, মেঘ ও কুয়াশায় মাখামাখি, সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের সীমানায় অবস্থিত পালমাজুয়ার (৭৩০০ ফিট) ঠিক উপরেই রয়েছে আরেকটি বনগ্রাম ধোত্রে (৮৫০০ ফিট)। ধোত্রে নামটির সঙ্গে হয়ত অনেকেই পরিচিত। ধোত্রে থেকে পাইন বনের মধ্যে দিয়ে প্রায় বারো কিলোমিটার পায়ে হাঁটা পথে পৌঁছে যাওয়া যায় পালমাজুয়া। কুয়াশা ঘেরা পাইন বনের রহস্যময় সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এই পথে হাঁটতে আমার খুব ভাল লাগে, বলাই বাহুল্য।

ছবির মতো সুন্দর গ্রাম পালমাজুয়া
পালমাজুয়া গ্রামের কাছাকাছি যেসব ছোট ছোট গ্রামগুলিতে পায়ে হেঁটে পৌঁছে যাওয়া যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিলপা, লোয়ার লিংশেবং, আপার বাসবটে, ছোটা হাট্টা, বড়া হাট্টা, রাই গাঁও, ফেঞ্চেটার, ফেদিখোলা ইত্যাদি। এছাড়া পালমাজুয়া থেকে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ঘুরে আসা সম্ভব রিম্বিক, মানেদারা, শ্রীখোলা ইত্যাদি জায়গা। দার্জিলিং পাহাড়ের নানা কোনে যখন পর্যটকদের ভীড় লেগেই থাকে তখন পালমাজুয়া এখনো আপনাকে উপহার দিতে পারে অপার শান্তি। এই গ্রামটিকেই আমরা বেছে নিয়েছিলাম হিমালয়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ভাবনার প্রচার, প্রসার ও প্রশিক্ষণের জন্য।
প্রসঙ্গত, পূর্ব হিমালয়ের অমূল্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের তাগিদে আমরা নেচার্স বেকন সংস্থা-র পক্ষ থেকে অরুণাচল, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত হিমালয়ের নানা প্রান্তে হিমালয়ের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের কথা আরও বেশি করে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যে কাজ করে থাকি সেই প্রকল্পের নাম ‘নেচার্স বেকনস হিমালয়ান বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন প্রোগ্রাম’ (Nature’s Beckon Himayan Biodiversity Programme)। হিমালয়ের দুষ্প্রাপ্য বন্যপ্রাণ রেড পান্ডা (Ailurus fulgens) হলো আমাদের এই প্রকল্প বা কর্মসূচীর প্রতীক।

নেচার্স বেকনস হিমালয়ান বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন প্রোগ্রাম

প্রকৃতি সংরক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা
গত ১৫ ও ১৬ই মে পালমাজুয়াতে আয়োজিত এই সংরক্ষণ কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নিয়েছিলেন আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের ছাত্র ছাত্রী, সাধারণ বাসিন্দা এবং শিক্ষক ও শিক্ষিকারা। পালমাজুয়ার নেচার রিসর্ট ‘সিঙ্গালিলা জাঙ্গল লজ’ ছিল এই কর্মশালার কেন্দ্র। আমি বলব হিমালয়ের এই কোণে প্রথমবার আয়োজিত এই কর্মশালা যথেষ্ট সফল ছিল। অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ, আনন্দ ও আন্তরিকতা ছিল চোখে পড়বার মতো। তাঁদের সবাইকে সার্টিফিকেট দেওয়া হলো। ঠিক হলো জুলাই-অগাস্ট মাসে ফের আমরা মিলিত হবো।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা

আশপাশের স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করে

হাতে কলমে প্রশিক্ষণ

প্রশিক্ষণের সঙ্গে ছিল দেদার আনন্দ
সবার উপরে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয় সিঙ্গালিলা জাঙ্গল লজের কর্ণধার দম্পতি সাঙ্গে শেরপা ও শিরশামোদি শেরপা-র কথা। তাঁদের উদ্যোগ ছাড়া এই কর্মসূচি সম্ভব হতো না। অত্যন্ত অমায়িক ও বিনয়ী এই দম্পতি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, পর্যটন থেকে আয়ের একটা অংশ ব্যয় করা উচিত সংলগ্ন বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের জন্য। তাঁদের পরিবেশ ও সমাজের জন্য কিছু করবার আকাঙ্ক্ষাতেই কিছুদিন আগে গড়ে উঠেছে সিঙ্গালিলা ওয়েলফেয়ার কমিউনিটি। আমাদের নেচার্স বেকনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই সংস্থাই আয়োজন করেছিল এই কর্মশালার, আর্থিক খরচ বহন করেছিলেন তাঁরাই।

প্রতিবেদকের সঙ্গে শেরপা দম্পতি
পাখিপ্রেমীদের জন্য আদর্শ জায়গা পালমাজুয়া। রিসর্টের চৌহদ্দিতেই আমি মোট ৩৮টি প্রজাতির পাখি নোট করতে পেরেছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নীল শামা (Himalayan Bluetail), সোনা বুলবুল (Black crested Bulbul), পাহাড়ি বুলবুল (Himalayan Bulbul), রেখা হাসিদামা (Streaked Laughingthrush), লালশির হাসিদামা (Chestnut crowned Laughingthrush), শ্যাম রামগাঙ্গরা (Green backed Tit), ডাকুল (Green Imperial Pegion), লাল ঘুঘু (Red Collared Dove), মহা বসন্তবৌরি (Great Barbet), বনমালি (Velvet fronted Nuthatch) ইত্যাদি। উল্লেখ্য, পাখিগুলির বাংলা নাম আমি সংগ্রহ করেছি ‘রংরুট’ প্রকাশিত ‘আমাদের পাখি’ বইটি থেকে। আমাদের আসামে এদের প্রচলিত নামগুলি একটু আলাদা। শুধু পাখিই কেন, বস্তুত সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের বন্যতার প্রাথমিক স্বাদ নিতে গেলে পালমাজুয়া একটি অতি উত্তম স্থান।

কুয়াশায় মাখামাখি নির্ভেজাল প্রকৃতি
যারা হিমালয়কে ভালোবাসেন, অরণ্য ও বন্যপ্রাণ ভালোবাসেন, যারা আমাদের প্রকৃতি রক্ষা আন্দোলনের সমর্থক, যারা পাহাড় অরণ্যের নির্জনতার মাঝে শান্তি খুঁজে পান, তাঁরা চাইলে দু-তিন রাত কাটিয়ে যেতে পারেন এই শেরপা দম্পতির আতিথেয়তায়। নিউ জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি ভাড়া করা ছাড়াও নানাভাবে পৌছনো যায় পালমাজুয়া। এক, শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি গাড়ি ছাড়ে সকালে, সময় লাগে ঘন্টা পাঁচেক। দুই, শিলিগুড়ি থেকে মানেভঞ্জন, মানেভঞ্জন থেকে ধোত্রে হয়ে পৌছনো যায়। তিন, শিলিগুড়ি থেকে সুখিয়াপোখরি-মানেভঞ্জন হয়ে। চার, শিলিগুড়ি থেকে রিম্বিকগামী গাড়ি যায় পালমাজুয়া হয়ে। বিস্তারিত জানতে ও বুকিং করতে সিঙ্গালিলা জাঙ্গল লজের সরাসরি যোগাযোগ নাম্বার ৭০৪৪১৮২৯২২।

সিঙ্গালিলা জাঙ্গল লজ
সবশেষে উল্লেখ করি, গত ৪৫ বছর ধরে আমরা ‘নেচার্স বেকন’ নামক সংস্থার পক্ষ থেকে আসাম ও উত্তরপূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বনপ্রাণ তথা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে কাজ করে চলেছি। শ্রদ্ধেয় পাঠক যদি আমাদের কাজকর্ম নিয়ে আগ্রহী থাকেন বা বিস্তারিত জানতে চান তাহলে www.naturesbeckon.org সাইটে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। ফেসবুকেও আমাদের কাজকর্মের খবর নিয়ে নিয়মিত আপডেট থাকে।