বঙ্কিমচন্দ্র বসন্তের কোকিলকে যতই অসময়ে না ডাকতে অনুরোধ জানান না কেন, বলাই বাহুল্য কোনো বসন্তেই বসন্তসখা সে কথা শোনে না। প্রতি বসন্তেই সেই ডাকে উদাসী মন উচাটন হয়। গাছে গাছে অশোক, শিমুল, পলাশের রক্তিম শোভা। ফাগুনে হাওয়ায় আবিরের সৌরভ। এমন রঙিন সময়ে কুহু ডাক শুনলে লেখকের কথাগুলো হুবহু মিলে যায়, মনে হয় “যেন এ জীবন বৃথায় গেল - সুখের মাত্রা যেন পূরিল না - যেন এ সংসারের অনন্ত সৌন্দর্য কিছুই ভোগ করা হইল না।” বসন্তকালে বসন্তের দূত তার মধুর তানে যখন বুকের ভিতর সংসারের অনন্ত সৌন্দর্য উপভোগের পিপাসাকে এইভাবে বাড়িয়ে দেয়, তখন সপ্তাহব্যাপী বৃষ্টির সম্ভাবনা জেনেও, পার্থিব সমস্ত সমস্যাকে পাশে রেখে, তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাহাড়মুখী হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

ট্রেন থেকে নেমে পাহাড়মুখী হওয়া মাত্রই সেই চেনা পাহাড়ি সুগন্ধ মন জুড়িয়ে দেয়। হাওয়ার শিরশিরে কাঁপন, অঢেল ফুলের সমারোহ, অসংখ্য পাখির কলতান আর তিস্তার সর্পিল গতির সৌন্দর্য-- সবকিছু সমেত এক উষ্ণ অভ্যর্থনায় দিন তিনেকের অতিথিকে কাছে টেনে নেয় বসন্তের পাহাড়। শুধু তো প্রকৃতি নয়, তার সঙ্গে জুড়ে থাকা অকৃত্রিম মানুষজন, তাদের আন্তরিক আতিথেয়তা, হাত বাড়ালে মেঘের নাগাল, আরও না বলা অনেক কিছুর জন্য মন বারবার পাহাড়ে ফিরতে চায়। পশ্চিম সিকিমের পরিচিত গ্ৰাম, কালুক-রিনচেংপং-এর আশেপাশে স্বল্পপরিচিত দুটি গ্ৰাম ছিল এবারের গন্তব্য। নাম তাদের মারতাম আর তাদং।

ক্রিমসন সানবার্ড
হি আর বার্মিয়কের মাঝে অবস্থিত মারতাম গ্ৰামের ধুঙ্গে হোমস্টের ঠিকানা ট্যুর প্ল্যানার গ্ৰুপ থেকেই পাওয়া। গ্ৰামের মধ্যে আরও দু-তিনটি হোমস্টে থাকলেও সবচেয়ে পুরোনো, অবস্থান ও গুণমানে উন্নত হল ধুঙ্গে হোমস্টে। কাঠের ব্যালকনির সামনে গুচ্ছ গুচ্ছ লাল ফুলে সেজে ওঠা গুরাস গাছটি শুরুতেই চোখ টানে। উল্টোদিকে পাহাড়মুখী বারান্দা থেকে মেলে অবারিত কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন। বসন্তের আকাশে সাদা মেঘের জমজমাট আধিপত্যে এবার তাঁর দেখা মেলেনি, তবে বিনিময়ে মন ভরিয়েছে মারতাম গ্ৰামের রঙিন পাখপাখালির দল। ছোট্ট সুন্দর নির্জন এক পাহাড়ি গ্ৰাম, উপরে গাছের ফাঁক দিয়ে এক মনাস্ট্রির চূড়া দেখা যাচ্ছে, মটরশুটি স্কোয়াশের চাষ হয়েছে কোনো কোনো বাড়ির সামনে, কমলালেবুর গাছ থেকে সব লেবুই পাড়া হয়ে গেছে, গরুর জন্য ঘাস কেটে সযত্নে নিয়ে যাচ্ছেন জনৈক বৃদ্ধ, মুখের রেখায় তাঁর কত যুগের আঁকিবুকি, অচেনা পাখির ডাকে বিকেল ফুরিয়ে আসার ইশারা, পড়ন্ত বেলার আলসেমি মেখে গ্ৰামের রাস্তায় হেঁটে এলে অকারণে মন ভালো হয়ে যায়।

ব্লু থ্রোটেড ব্লু ফ্লাইক্যাচার
সারা বছরে হাতে গোনা যে কয়টা সকালে চোখ মেললে পাহাড় দেখতে পাই, সেই সকালগুলো এমনিতেই নিজগুণে অনেক বেশি আনন্দঘন হয়ে ওঠে। তার উপরে পক্ষীপ্রেমী হলে বাড়তি মাত্রা যোগ হয় মারতাম-এ। সকালের নরম আলো ডানায় মেখে কলকাকলিতে মাতিয়ে তোলে রঙ-বেরঙের পাখিরা। এগাছ থেকে ওগাছ, এই ফুল থেকে ওইফুলে দুলে দুলে তাদের সে নাচন দেখে আর আশ মেটে না। কাঞ্চনজঙ্ঘা ব্যতিরেকে মারতাম গ্ৰামের সুনাম ছড়াতে এই পক্ষীকুলের অবদান অনেকখানি।

ব্ল্যাক থ্রোটেড সানবার্ড
হোমস্টের মালিক গণেশ ছেত্রীজীর প্রজ্ঞা যতখানি মুগ্ধ করে, ততটাই ভালো লাগে তাঁর ও তাঁর পরিবারের মানুষগুলির সুন্দর ব্যবহার। ছেত্রীজীর মা, নিজে হাতে গৃহকর্ম সম্পাদনের ফাঁকে দেখা হলেই অনাবিল হাসি দিয়ে যেভাবে কুশল সম্ভাষণ করেন, ভাষাগত কোনো দূরত্ব তাঁর সঙ্গে অতিথিদের আছে বলেই মনে হয় না। আসলে, এই হল পাহাড়, এই হল তার মানুষ, এই হল তার সবুজ গাছ-গাছালি, মেঘ নদী নিয়ে সম্পূর্ণ এক অবয়ব; মনের ভিতরে এই সবকিছু নিয়ে, প্রকৃতপক্ষে অনেকখানি উচ্চতায় সে এমন বেশিরকম জীবন্ত হয়ে থাকে বলেই রোজকার জীবনের পাহাড় প্রমাণ কষ্টগুলোও তুচ্ছ মনে হয়।

ভার্ডিটার ফ্লাইক্যাচার
(যদিও দুবার ‘পাহাড়’ লিখলে সমাপতনটা শুনতে ভালো লাগে বলেই লেখার লোভ হল, নাহলে পাহাড়ে গেলে পাহাড় ডিঙিয়ে পাঁচ বছরের খুদে মানুষের স্কুল যাওয়া থেকে শুরু করে অশীতিপর মানুষের নিরলস জীবন সংগ্ৰাম দেখলে, 'পাহাড় প্রমাণ' কষ্টের কথা লেখা তো দূর, ভাবতেও দুবার কান মুলতে হয়।)

ভেলভেট ফ্রন্টেড নাটহ্যাচ
মারতাম থেকে বিদায় নিয়ে রিনচেংপং হয়ে শতাব্দী প্রাচীন মনাস্ট্রির পবিত্র নিস্তব্ধতা ছুঁয়ে দুপুরের আগেই পৌঁছে গেলাম তাদং-এর তালেঘর হোমস্টেতে। এই হোমস্টে মালিকের পূর্বপুরুষ প্রথম এখানে দোতলা বাড়ি তৈরি করেন বলে স্থানীয়দের মুখে এটি ‘তালেঘর’ নামে পরিচিত হয়। পাহাড়মুখো সুন্দর একটি ব্যালকনি এখানেও আমাদের মন প্রফুল্ল করে। মা-বাবা-মেয়ে, পরিবারের তিন সদস্য হাসিমুখে অভ্যর্থনা করেন আমাদের। সকলের মুখে সেই সরল আতিথেয়তার অভিব্যক্তি। মেয়েটি ভারি মিষ্টি, তার নাম দীপা। ব্যাগপত্র রেখে এক চক্কর ঘুরে আসি, গ্ৰামটির নির্জন পরিবেশ মন ভালো করা। মূলত এই নিরালার সন্ধানেই অচেনা গ্ৰামটিতে আসা। হোমস্টের সামনেই একটা গাছ বসন্তের ধ্বজা উড়িয়ে থোকায় থোকায় গোলাপী ফুলে সেজে উঠেছে। গণেশজী আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েই চলে যান না। পরম সুহৃদের মতো দুই হোমস্টের মালিক আলাপে মাতেন। তাদের জলের মতো সহজ সরল ব্যবহার, পারস্পরিক আদান প্রদান চিরকাল দেখতে ভালো লাগে।

এবার বসন্তের পাহাড়ে বৃষ্টির দেখা পাব, তা অনেকখানি জানাই ছিল। ঘুমের মধ্যে বৃষ্টির সে ধারাপাত দুই রাতেই চোখে স্বপ্ন এঁকে যায়। রাতের বৃষ্টি এমনিতেই বড়ো রোম্যান্টিক আর কাব্যগন্ধী। আর যদি সেখানে থাকে পাহাড়ি প্রেক্ষাপট, তার মৌতাত অন্যরকম।

আমাদের প্রায় অর্ধেক বয়সী মেয়েটির কর্মনিষ্ঠা, অতিথিদের প্রতি নম্র মৃদু শিষ্ট আচরণ, প্রতিটি প্রয়োজনের সতর্ক খেয়াল রাখা, মায়ের মতো মমতায় সুস্বাদু সব পদ রান্না করে খাওয়ানো, উদয়াস্ত প্রস্ফুটিত ফুলের মতো তার চোখেমুখে স্নিগ্ধ হাসির সুবাস বসন্তের ফুলে ভরা গাছটির চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। মৃদুভাষী এই মিষ্টি বোনটির আচরণের মাধুর্যে যেন তাদং তথা সমগ্ৰ সিকিমের পাহাড় প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রতিফলিত হচ্ছিল।

তাদং-এর পথে চলতে গেলে মোচাফুলের মধুর আকর্ষণে ছোট্ট সানবার্ডের ঘুরে ঘুরে মধু খেতে আসা যেমন চোখ টানে, তেমনি গ্ৰামের ও মাথার দোকানের চিপস চকলেটের সম্মোহনী টানে বছর চারেকের ছোট্ট মানুষটির পোষ্যের সঙ্গে হেলেদুলে এগিয়ে যাওয়াও কৌতুক জাগায়। এইভাবেই এবারের ছোট্ট ভ্রমণে ফুল-পাখি-প্রকৃতি-মানুষ-বৃষ্টি মিলেমিশে ‘মারতাম’ ও ‘তাদং’ নামের ছোট্ট গ্ৰামদুটির টুকরো টুকরো ছবি জুড়ে হৃদয়ে যে স্মৃতির কোলাজ বানিয়ে তোলে, সে কোলাজ হৃদমাঝারে রয়ে যায় মাঝে মাঝেই আলতো আদরে তাকে ছুঁয়ে দেখার অপেক্ষায়।

যোগাযোগ : ধুঙ্গে হোমস্টে মারতাম ৯৭৩৩২৬৯৪১৩; তালেঘর হোমস্টে তাদং ৭০০২৬৭৭৫৯৩